চাকরির খোঁজ চালিয়ে যাওয়া বেকার যুবক-যুবতীদের হাতে সামান্য হলেও আর্থিক সাপোর্ট পৌঁছে দেওয়াই পশ্চিমবঙ্গ যুবশ্রী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। যুবশ্রী প্রকল্প ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর চালু হওয়া এই প্রকল্পে যোগ্য বেকার প্রার্থীরা প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা বেকারত্ব ভাতা পেয়ে থাকেন। টাকাটা কম শোনালেও চাকরির প্রস্তুতি বা দৈনন্দিন খরচে বেশ কাজে লাগে।
আজকের লেখায় থাকছে যুবশ্রী প্রকল্পের যোগ্যতার শর্ত, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট এবং আবেদন প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ তথ্য। শুরুতেই এক নজরে দেখে নিন প্রকল্পের প্রধান তথ্যগুলো।
এক ঝলকে
এক নজরে যুবশ্রী প্রকল্প
যুবশ্রী প্রকল্প কী এবং কেন শুরু হলো
যুবশ্রী প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল “যুব উৎসব প্রকল্প (YUP) ২০১৩” নামে, এবং ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এটির নাম বদলে রাখা হয় যুবশ্রী। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শ্রম বিভাগ এই প্রকল্প পরিচালনা করে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য দুটি — এক, সম্পূর্ণ বেকার যুবকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া; দুই, সেই সহায়তাকে ভিত্তি করে তাদের দক্ষতা বিকাশ ও স্বাবলম্বী হওয়ার পথ সহজ করা। উল্লেখযোগ্য, রাজ্য সরকার প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ বেকার যুবককে এই ভাতা দিয়ে থাকে, এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন হয় প্রথম-আগত-প্রথম-সেবা (first come, first serve) ভিত্তিতে। তাই যত আগে আবেদন করবেন, তত দ্রুত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা।
যুবশ্রী প্রকল্পে যোগ্যতার শর্ত
আবেদন করার আগে নিচের শর্তগুলো মিলিয়ে নিন —
- পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- আবেদনকারীকে সম্পূর্ণ বেকার হতে হবে — চাকরি বা নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস থাকলে হবে না।
- এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে চাকরি-সন্ধানী (job seeker) হিসেবে নথিভুক্ত থাকতে হবে — এটি সবচেয়ে জরুরি শর্ত।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: অন্তত অষ্টম শ্রেণি (বা তার বেশি) পাস থাকতে হবে।
- বয়সসীমা ১৮ থেকে ৪৫ বছর।
- অন্য কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তা নিচ্ছেন না — তা হলে আবেদন করা যাবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম — একটি পরিবারের একজনের বেশি সদস্য এই ভাতা পাবেন না।
যুবশ্রী আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
আবেদনের সময় নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে —
বাসস্থানের প্রমাণ (যেকোনো একটি):
- রেশন কার্ড
- ভোটার কার্ড
- আধার কার্ড
- পাসপোর্ট
বয়সের প্রমাণ:
- জন্ম সার্টিফিকেট (বা যেকোনো সরকারি নথিতে জন্ম তারিখ)
অন্যান্য নথি:
- পাস করা সব পরীক্ষার মার্কশিট বা সার্টিফিকেট
- এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কের রেজিস্ট্রেশন কার্ড
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ
- আয়ের শংসাপত্র
- বেকারত্বের শংসাপত্র
- স্ব-ঘোষিত শংসাপত্র
- শারীরিক অক্ষমতার শংসাপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- জাতির শংসাপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
যুবশ্রীতে কীভাবে আবেদন করবেন
যুবশ্রী প্রকল্পে আবেদনের একমাত্র পথ হলো এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংক পোর্টাল — এর বাইরে কোনো আবেদন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় না। ধাপে ধাপে আবেদন করুন এভাবে —
- এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংকে নথিভুক্ত হন: পোর্টালে গিয়ে চাকরি-সন্ধানী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করুন। নথিভুক্ত না হলে আবেদনই করা যাবে না।
- যুবশ্রীর জন্য আবেদন করুন: এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে যুবশ্রী বেকারত্ব ভাতার আবেদন জমা দিন।
- যাচাইয়ের অপেক্ষা করুন: আবেদন যাচাই হয়ে গেলে ভাতা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে।
ভাতা চালু থাকার শর্ত: প্রতি ৬ মাসে ফর্ম জমা
অনেকেই জানেন না — যুবশ্রী ভাতা পেতে হলে কেবল একবার আবেদন করলেই চলে না। প্রতি ৬ মাসে সুবিধাভোগীকে একটি স্ব-ঘোষিত ফর্ম জমা দিতে হয় —
- সাধারণ ক্ষেত্রে: সাব-ডিভিশনাল অফিসারের (SDO) অফিসে
- কলকাতার ক্ষেত্রে: জয়েন্ট ডাইরেক্টর অফ এমপ্লয়মেন্ট, কলকাতার অফিসে
নির্দিষ্ট সময়ে ফর্ম জমা না দিলে ভাতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে — তাই তারিখ মনে রাখা জরুরি।
আঞ্চলিক এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ অফিসের ঠিকানা
যুবশ্রী ও এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংক সংক্রান্ত কাজকর্মের জন্য আপনার জেলার এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসের ঠিকানা নিচে দিলাম —
বাকি জেলাগুলোর অফিসের ঠিকানা এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
হেল্পলাইন ও যোগাযোগ
- যুবশ্রী / এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংক হেল্পলাইন: ০৩৩-২২৩৭৬৩০০
- পশ্চিমবঙ্গ শ্রম বিভাগ হেল্পলাইন: ১৮০০১০৩০০০৯
- অফিশিয়াল ওয়েবসাইট: পশ্চিমবঙ্গ এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংক পোর্টাল
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্র: যুবশ্রী প্রকল্পে কত টাকা ভাতা পাওয়া যায়?
উ: যোগ্য বেকার যুবক-যুবতীরা প্রতি মাসে ₹১,৫০০ করে বেকারত্ব ভাতা পান।
প্র: যুবশ্রীর জন্য বয়সসীমা কত? উ: ১৮ থেকে ৪৫ বছর।
প্র: যুবশ্রী প্রকল্পে আবেদন করার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কী?
উ: অষ্টম শ্রেণি বা তার বেশি পাস।
প্র: যুবশ্রীতে আবেদন করা যায় কোথায়?
উ: শুধুমাত্র এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংক পোর্টালের মাধ্যমে — অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় না। তবে আবেদনের আগে এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংকে চাকরি-সন্ধানী হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক।
প্র: এক পরিবারের একাধিক জন যুবশ্রী ভাতা পেতে পারেন?
উ: না, একটি পরিবারের একজন সদস্যের বেশি এই ভাতা পান না।
প্র: ভাতা চালু রাখতে প্রতি বছর কিছু করতে হয়?
উ: হ্যাঁ, প্রতি ৬ মাসে স্ব-ঘোষিত ফর্ম SDO অফিসে (কলকাতায় জয়েন্ট ডাইরেক্টর অফ এমপ্লয়মেন্টের অফিসে) জমা দিতে হয়।
যুবশ্রী প্রকল্প বেকার যুবক-যুবতীদের কাছে সরকারের পাশে থাকার একটা প্রতীক — চাকরির বাজারে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সময়টায় যে সামান্য আর্থিক ভিত্তিটা দরকার, তা মেটায়। আবেদন করতে চাইলে আজই এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংকে নথিভুক্ত হয়ে যান, কারণ সুবিধাভোগী নির্বাচন হয় প্রথম-আগতের ভিত্তিতে। লেখাটি কারও কাজে এলে শেয়ার করে দিন, আর নতুন আপডেটের জন্য আমাদের সঙ্গেই থাকুন।





