মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সবচেযেই পরিচিত সরকারি উদ্যোগ হল কন্যাশ্রী প্রকল্প। ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে চালু এই প্রকল্পে পড়াশোনারত অবিবাহিত মেয়েরা দু’ধাপে আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন — স্কুলজীবনে বছরে ১,০০০ টাকা এবং দ্বাদশ পাশের পর এককালীন ২৫,০০০ টাকা। মহিলা ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ বিভাগ এই প্রকল্পের নোডাল দপ্তর।
শুধু টাকা দেওয়াই নয় — এটি একটি শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর (Conditional Cash Transfer) প্রকল্প। অর্থাৎ মেয়েটি পড়াশোনা চালিয়ে গেলে ও অবিবাহিত থাকলেই সহায়তা চলতে থাকে। ফলে প্রকল্পটি মেয়েদের স্বাক্ষরতার হার বাড়ানোর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধেও কার্যকর ভূমিকা নিয়েছে — এই কারণেই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলেও কন্যাশ্রী প্রশংসিত হয়েছে।
আজকের লেখায় থাকছে কন্যাশ্রীর দুটি ধাপ (K1 ও K2), যোগ্যতার শর্ত, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ও আবেদন প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ তথ্য।
এক ঝলকে
এক নজরে কন্যাশ্রী প্রকল্প
K1 — বার্ষিক বৃত্তি (১৩–১৮ বছর): ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্যে থাকা অবিবাহিত, পড়াশোনারত মেয়েরা প্রতি বছর ₹১,০০০ হারে আর্থিক সাহায্য পান। এই টাকা দুর্বল আর্থিক পরিবারের মেয়েদের স্কুলে চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
K2 — এককালীন অনুদান (১৮–১৯ বছর): দ্বাদশ শ্রেণি বা সমতুল্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়সের মধ্যে থাকা অবিবাহিত ছাত্রীরা পান এককালীন ₹২৫,০০০ অনুদান। এই টাকায় উচ্চশিক্ষার খরচ মেটানো সহজ হয়।
মনে রাখুন: ১৯ বছরের বেশি বয়সী মেয়েরা কন্যাশ্রীর সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। আর প্রতিটি কিস্তির আগে মেয়েটিকে অবিবাহিত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি থাকতে হয়।
কন্যাশ্রী প্রকল্পে যোগ্যতার শর্ত
- বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে হতে হবে।
- মেয়েটিকে অবিবাহিত হতে হবে।
- পড়াশোনারত থাকতে হবে — নিচের যেকোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি:
- সরকার স্বীকৃত নিয়মিত বিদ্যালয়
- মাদ্রাসা বা সমতুল্য মুক্ত বিদ্যালয়
- কলেজ বা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
- কারিগরি / শিক্ষক / ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
- পারিবারিক আয় সীমা: মেয়েটির পরিবারের বাৎসরিক আয় ₹১,২০,০০০-এর বেশি হতে পারবে না।
- পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হবে।
আয়সীমার ছাড় কাদের পাওয়া যায়
বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক আয়ের শর্ত শিথিল করা হয় —
- মেয়েটির শারীরিক অক্ষমতা ৪০% বা তার বেশি হলে
- মেয়েটির বাবা-মা দুজনেই মারা গিয়ে থাকলে
- মেয়েটি কোনো সরকারি কিশোরী আবাসে (juvenile home) থাকলে
কন্যাশ্রী আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
আবেদনপত্রের সঙ্গে নিচের কাগজপত্রগুলো জুড়তে হবে —
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- জন্ম সার্টিফিকেট
- পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণপত্র
- আধার কার্ড
- ব্যাঙ্কের যাবতীয় নথি
- অবিবাহিত অবস্থার ঘোষণাপত্র
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির (ভর্তি) শংসাপত্র
- প্রতিবন্ধকতার শংসাপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- স্ব-ঘোষিত আয়ের শংসাপত্র
কন্যাশ্রীতে কীভাবে আবেদন করবেন
কন্যাশ্রী প্রকল্পে আবেদন করা যায় একমাত্র আবেদনপত্রের মাধ্যমে। প্রক্রিয়াটা সহজ —
- ফর্ম সংগ্রহ করুন: মেয়েটি যে স্কুল, কলেজ বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পড়ে, সেখান থেকে বা স্থানীয় ব্লক/পৌর অফিস থেকে আবেদনপত্র নিন।
- সঠিকভাবে পূরণ করুন: বয়স, ঠিকানা, শিক্ষাগত তথ্য ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ ভুল না হয় বলে যাচাই করে লিখুন।
- নথি সংযুক্ত করুন: উপরের তালিকার সব কাগজ ফর্মের সঙ্গে জুড়ুন।
- জমা দিন ও যাচাইয়ের অপেক্ষা করুন: ফর্ম জমা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করে অনুমোদন করলে টাকা মেয়েটির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়।
টিপস: ফর্মে থাকা সব তথ্য (বিশেষ করে জন্মতারিখ ও বানান) জন্ম সার্টিফিকেট ও আধার কার্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিন — বানানের অমিলে আবেদন আটকানোর ঘটনা ঘটে।
যোগাযোগ ও হেল্পলাইন
- কন্যাশ্রী হেল্পলাইন: ০৩৩-২৩৩৭৩৮৪৬, ৯০০৭৪৬২০৮৮
- মহিলা ও শিশু উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ দপ্তর: ০৩৩-২৩৩৪১৫৬৩, ০৩৩-২৩৩৭১৭৯৭
- অফিশিয়াল ওয়েবসাইট: পশ্চিমবঙ্গ কন্যাশ্রী প্রকল্প পোর্টাল (সেখানে প্রকল্পের নির্দেশিকা ও মোবাইল অ্যাপের ব্যবহারবিধি পাওয়া যায়)
কন্যাশ্রী শুধু একটা ভাতা-প্রকল্প নয় — মেয়েকে স্কুলে রাখা, বাল্যবিবাহ ঠেকানো এবং উচ্চশিক্ষার দরজা খোলা রাখার একটি সমাজ-বদলের হাতিয়ার। পরিবারের ১৩–১৯ বছরের মেয়ে থাকলে আজই স্কুলে বা স্থানীয় অফিসে যোগাযোগ করে আবেদন সম্পর্কে জেনে নিন। লেখাটি কারও কাজে লাগলে শেয়ার করে প্রয়োজনের মানুষের কাছে পৌঁছে দিন।





