পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে এবং বাল্যবিবাহ রোধে যে ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প এতদিন পরিচালিত হতো, তা এবার নতুন নামে চলবে — ‘কন্যারত্ন প্রকল্প‘ (Kanyaratna Scheme)
সম্প্রতি নবান্ন সভাঘরে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নাম পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। শুধু প্রকল্পের নামই নয়, বদলেছে দিনটিও — ১৪ আগস্ট যেটি এতদিন ‘কন্যাশ্রী দিবস’ হিসেবে পালিত হতো, এখন থেকে সেটি ‘কন্যারত্ন দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হবে।
তবে সবচেয়ে জরুরি খবরটা হলো — Kanyaratna Scheme-এর সুবিধার পরিমাণ ও শর্তাবলি অপরিবর্তিত আছে। অর্থাৎ K1-এর বার্ষিক ১,০০০ টাকা, K2-এর এককালীন ২৫,০০০ টাকা — সব আগের মতোই। আজকের লেখায় তিনটি ধাপ, যোগ্যতা, নথি ও আবেদন প্রক্রিয়া — সবটা গুছিয়ে দিলাম।
এক ঝলকে
West Bengal Kanyaratna Scheme: ‘কন্যারত্ন’ প্রকল্প কী
কন্যারত্ন প্রকল্প হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি আর্থিক সহায়তা প্রকল্প, যা আগে কন্যাশ্রী প্রকল্প (Kanyashree Prakalpa) নামে পরিচিত ছিল। কোনো যোগ্য ছাত্রী যেন আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা থেকেযেন দূরে না থাকে, তা সুনিশ্চিত করাই এর কন্যাশ্রী প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য।
কন্যাশ্রী থেকে কন্যারত্ন: নাম বদলে কী বদলালো, আর কি কি বদলায়নি
নবান্ন সভার তথ্য অনুযায়ী, নতুন Kanyaratna Scheme-এর সুযোগ-সুবিধা পূর্বতন কন্যাশ্রী প্রকল্পের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে।
যা বদলেছে:
- প্রকল্পের নাম — কন্যাশ্রী থেকে কন্যারত্ন
- উদযাপনের দিন — কন্যাশ্রী দিবস থেকে কন্যারত্ন দিবস
যা বদলায়নি:
- আর্থিক সহায়তার পরিমাণ
- যোগ্যতার শর্তাবলি
- আবেদন প্রক্রিয়া
- প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য
অর্থাৎ যাঁরা আগে কন্যাশ্রীর সুবিধা পেতেন, তাঁদের কিছুই নতুন করে করতে হবে না — শুধু নামটাই বদলেছে। প্রকল্পের লক্ষ্য একই আছে :, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছাত্রীদের বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করে উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করা এবং স্বাবলম্বী করে তোলা।
Kanyaratna Scheme-এর তিনটি ধাপ: K1, K2 ও K3
কন্যারত্ন প্রকল্পে মূলত তিনটি ধাপে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয় —
- Kanyaratna K1 — ১৩–১৮ বছরের ছাত্রীদের বার্ষিক ১,০০০ টাকা বৃত্তি
- ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি) ছাত্রীদের পড়াশোনার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে প্রতি বছর ১,০০০ টাকা করে বার্ষিক বৃত্তি দেওয়া হয়। এই টাকা বই, খাতা, যাতায়াতের মতো ছোটখাটো খরচে কাজে লাগে — ফলে আর্থিক কারণে মেয়েদের স্কুল ছাড়ার হার কমে।
- Kanyaratna K2 — ১৮ বছরে এককালীন ২৫,০০০ টাকা অনুদান, ছাত্রী ১৮ বছর পূর্ণ করলে এবং অবিবাহিত থাকলে তাঁকে এককালীন ২৫,০০০ টাকা অনুদান দেওয়া হয়। এই টাকাটা উচ্চশিক্ষার ভর্তি ফি, বই বা কোচিং-এর কাজে বড় সহায়ক কাজে লাগানোর জন্য মূলত দেওয়া হচ্ছে।
- Kanyaratna K3 — স্নাতকোত্তর ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা সহায়তা
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর (Postgraduate) স্তরে বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য বিভাগে পাঠরত মেধাবী ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য এই ধাপে সহায়তা করা হয়। যাঁরা পড়াশোনায় ভালো করছেন এবং স্নাতকোত্তর পর্যন্ত যেতে চান, তাঁদের জন্য এই ধাপটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবে? (Eligibility Criteria)
কন্যারত্ন প্রকল্পের যোগ্যতা পূরণ করতে হলে নিচের শর্তগুলো থাকতে হবে —
- আবেদনকারীকে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- সরকার স্বীকৃত কোনো বিদ্যালয়, কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠরত হতে হবে।
- K1: বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর।
- K2: বয়স ১৮ থেকে ১৯ বছর এবং ছাত্রীকে অবশ্যই অবিবাহিত হতে হবে।
- পারিবারিক আয়: পরিবারের বার্ষিক আয় ₹১,২০,০০০-এর নিচে হতে হবে।
এই প্রকল্পে-এ পারিবারিক আয়ের সীমা যাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে কন্যারত্ন প্রকল্পের আয়সীমা প্রযোজ্য নয় —
- ৪০% বা তার বেশি বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন / প্রতিবন্ধী ছাত্রী
- অনাথ ছাত্রী
- জুভেনাইল জাস্টিস হোমে বসবাসকারী ছাত্রী
অর্থাৎ এই তিন শ্রেণির ছাত্রীদের পরিবারের আয় যতই হোক, তাঁরা আবেদন করতে পারবেন।
মিস করবেন না: যুবশক্তি প্রকল্প ডকুমেন্ট লিস্ট ২০২৬: ৩০০০ টাকা পেতে কী কী কাগজ লাগবে? সম্পূর্ণ গাইড
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র (Documents Required)
কন্যারত্ন ডকুমেন্ট লিস্ট অনুযায়ী আবেদনপত্রের সঙ্গে নিচের নথিগুলো জমা দিতে হবে —
- জন্ম শংসাপত্র (Birth Certificate)
- আধার কার্ড
- অবিবাহিত থাকার স্ব-ঘোষণাপত্র (Self Declaration Form)
- পরিবারের বার্ষিক আয়ের শংসাপত্র (Income Certificate)
- ছাত্রীর নিজস্ব ব্যাঙ্ক পাসবইয়ের প্রথম পাতার কপি — যেখানে নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোড স্পষ্ট দেখা যায়
- সম্প্রতি তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে: প্রতিবন্ধী শংসাপত্র বা পিতা-মাতার মৃত্যু শংসাপত্র
টিপস: ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অবশ্যই ছাত্রীর নিজের নামে হতে হবে। Kanyaratna Scheme-এর সমস্ত অনুদান DBT-র মাধ্যমে সরাসরি ব্যাঙ্কে যায়, তাই অ্যাকাউন্টের তথ্য ভুল থাকলে টাকা আটকে যাবে।
আবেদন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া (Application Process)
কন্যারত্ন আবেদন পদ্ধতি মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অফলাইনে সম্পন্ন হয় —
- ফর্ম সংগ্রহ করুন: ছাত্রীরা নিজেদের স্কুল বা কলেজ থেকে বিনামূল্যে আবেদনপত্র পাবেন। মনে রাখবেন — K1-এর জন্য হালকা সবুজ রঙের এবং K2-এর জন্য হালকা নীল রঙের ফর্ম দেওয়া হয়। সঠিক রঙের ফর্ম নিন।
- ফর্ম পূরণ ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক: সঠিকভাবে ফর্ম পূরণ করে নিজের নামে থাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ সংযুক্ত করুন। সব অনুদান DBT-তে যাবে।
- জমা ও রসিদ: পূরণ করা ফর্ম স্কুলের প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকার কাছে জমা দিন। সেখান থেকে একটি অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ (Acknowledgement Slip) এবং ফর্ম নম্বর পাবেন।
- স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং: প্রাপ্ত ফর্ম নম্বর ব্যবহার করে অফিশিয়াল পোর্টালে গিয়ে আবেদনের বর্তমান অবস্থা যাচাই করুন।
গুরুত্বপূর্ণ: অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ ও ফর্ম নম্বরটি অবশ্যই যত্নে রাখুন — পরে স্ট্যাটাস দেখতে বা সমস্যা হলে এটাই একমাত্র প্রমাণ।
প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘কন্যারত্ন’ করা হলেও এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে কোনও পরিবর্তন আসেনি। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছাত্রীদের বাল্যবিবাহ থেকে সুরক্ষা দেওয়া, উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতে স্বনির্ভর করে তোলাই এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। আশা করা হচ্ছে, এই উদ্যোগ ছাত্রীদের শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।