রাজ্যের কন্যাসন্তানদের পড়াশোনা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ আরও সুরক্ষিত করতে ‘কন্যারত্ন’ প্রকল্পে নতুন আর্থিক সুবিধার ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, স্কুলে পড়ুয়া ছাত্রীরা বছরে ২,০০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্য পাবে। অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার জন্য যোগ্য ছাত্রীদের এককালীন ৫০,০০০ টাকা অনুদান দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই নতুন সুবিধাগুলি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, উচ্চশিক্ষার খরচ চালাতে ছাত্রীদের স্বামী বিবেকানন্দ Merit-cum-Means Scholarship (SVMCM) সহ অন্যান্য সরকারি বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই লেখায় দুটোই আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হলো, সঙ্গে কোন তথ্যগুলো এখনও সরকারি নির্দেশিকার অপেক্ষায়।
এক ঝলকে
কন্যারত্ন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | কন্যারত্ন প্রকল্প ২০২৭ (Kanyaratna Scheme) |
| আগের নাম | কন্যাশ্রী প্রকল্প ২০২৬ |
| বার্ষিক স্কলারশিপ | ₹২,০০০ |
| এককালীন অনুদান | ₹৫০,০০০ পর্যন্ত |
| প্রকল্পের লক্ষ্য | কন্যাশিক্ষার প্রসার, স্কুলছুট রোধ ও নারী ক্ষমতায়ন |
| কারা উপকৃত হবে | যোগ্য ছাত্রী ও কন্যারা |
| কার্যকর হওয়ার কথা | ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে |
কন্যারত্ন প্রকল্পে বছরে ₹২,০০০ স্কলারশিপ
- স্কুলের ছাত্রীদের পড়াশোনায় উৎসাহ জোগাতে এবং মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা কমাতে বার্ষিক আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছে।
- আগে এই প্রকল্পের আওতায় ছাত্রীদের বছরে ১,০০০ টাকা করে দেওয়া হতো। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, সেই টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে বছরে ২,০০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। ফলে পড়াশোনার খরচ চালাতে ছাত্রীদের পরিবার কিছুটা হলেও বাড়তি আর্থিক সুবিধা পাবে।
উচ্চশিক্ষায় এককালীন ₹৫০,০০০ অনুদান
- দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রীরা যাতে টাকার অভাবে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য না হন, সেই লক্ষ্যেই এককালীন অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
- আগে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে যোগ্য ছাত্রীরা এককালীন ২৫,০০০ টাকা পেতেন। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, সেই অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০,০০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার খরচ সামলাতে ছাত্রীদের পরিবার কিছুটা বাড়তি আর্থিক সাহায্য পাবে।
কন্যাশ্রী K2 টাকা কবে ঢুকবে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের যে সমস্ত ছাত্রীরা কন্যাশ্রী K2 প্রকল্পে আবেদন করেছেন, তাঁরা এখন অপেক্ষা করছেন এককালীন ২৫,০০০ টাকা পাওয়ার জন্য। অনেকের মনেই প্রশ্ন, নভেম্বর মাসে কি K2-এর টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে, নাকি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে?
৬ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কন্যাশ্রী K2-এর টাকা দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনও তারিখ সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে আবেদনপত্রের যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ধাপে ধাপে উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়। তাই যাঁদের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে, তাঁদের পেমেন্ট স্ট্যাটাস নিয়মিত খোঁজ রাখা উচিত।
অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: https://kanyashree.wb.gov.in/track-application-status
বিশেষ পরামর্শ: আবেদন করার পরেও টাকা না ঢুকলে নিজের স্কুল বা কলেজের Kanyashree Nodal Teacher-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্যও ঠিক রয়েছে কি না যাচাই করে নিন।
মিস করবেন না: Kanyaratna Scheme: কন্যাশ্রী এখন ‘কন্যারত্ন’ ছাত্রীদের ২৫,০০০ টাকা দেবে সরকার? কারা পাবেন, কীভাবে আবেদন করবেন
কন্যারত্ন প্রকল্প কারা পাবে (Eligibility Criteria)
কন্যারত্ন প্রকল্পের সুবিধা পেতে আবেদনকারীদের নিম্নলিখিত শর্তগুলি পূরণ করতে হবে –
সাধারণ যোগ্যতা (General Eligibility)
- আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- নিয়মিতভাবে কোনো স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে হবে।
- আবেদনকারীকে অবিবাহিত হতে হবে।
- পরিবারের বার্ষিক আয় ₹১,২০,০০০ টাকার বেশি হওয়া চলবে না।
বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় :
নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে পরিবারের আয় ₹১,২০,০০০ টাকার বেশি হলেও আবেদন করা যাবে –
- ৪০% বা তার বেশি প্রতিবন্ধী ছাত্রী
- সরকার অনুমোদিত শিশু নিবাসে থাকা ছাত্রী
- উভয় পিতা-মাতা মৃত এমন ছাত্রী
প্রয়োজনীয় নথিপত্র ( kanyaratna Prakalpa Documents)
আবেদন করার সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথির ফটোকপি জমা দিতে হবে। সেগুলি হল—
- জন্ম শংসাপত্র (Birth Certificate): আবেদনকারীর বয়স যাচাই করার জন্য জন্ম শংসাপত্র লাগবে।
- অবিবাহিত থাকার ঘোষণাপত্র (Declaration of Unmarried Status): আবেদনকারী অবিবাহিত, তা প্রমাণ করার জন্য অভিভাবকের স্বাক্ষর করা ঘোষণাপত্র জমা দিতে হবে।
- পরিবারের আয়ের শংসাপত্র (Family Income Certificate): পরিবারের বার্ষিক আয় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকার মধ্যে, তা প্রমাণ করার জন্য এই শংসাপত্র প্রয়োজন।
- আধার কার্ড (Aadhaar Card): আবেদনকারীর পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য আধার কার্ডের কপি দিতে হবে।
- ব্যাঙ্কের পাসবই (Bank Account Proof): ছাত্রীর নিজের নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। এর প্রমাণ হিসেবে পাসবইয়ের প্রথম পাতার ফটোকপি জমা দিতে হবে।
- ডিবিটি লিঙ্ক (DBT Link): প্রকল্পের টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাওয়ার জন্য DBT সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও সংযোগ থাকতে হবে।
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি (Photograph): আবেদনকারীর সাম্প্রতিক রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি জমা দিতে হবে।
কন্যারত্ন প্রকল্পে আবেদন পদ্ধতি (Kanyaratna Prakalpa Application Process)
কন্যারত্ন প্রকল্পে আবেদনের পদ্ধতি মূলত K1, K2 ও K3 বিভাগের জন্য আলাদা। K1 ও K2-এর ক্ষেত্রে অফলাইনে আবেদন করতে হয়। অন্যদিকে, K3-এর জন্য অনলাইনে SVMCM পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।
K1 ও K2 – অফলাইনে আবেদন করার নিয়ম
আবেদনের আগে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে রাখুন:-
আবেদন করার আগে ছাত্রীর নিজের নামে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা জরুরি। প্রয়োজনে বাবা-মা বা অভিভাবকের সাহায্যে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এই অ্যাকাউন্ট খোলা যেতে পারে।
আবেদনপত্র কোথা থেকে পাবেন?
ছাত্রী যে স্কুল, কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পড়াশোনা করছেন, সেখান থেকেই আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে। আবেদন করার সময় সঠিক ফর্ম নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
- K1 ফর্ম: বার্ষিক বৃত্তির জন্য এই ফর্ম ব্যবহার করা হয়। এটি হালকা সবুজ রঙের কাগজে ছাপানো থাকে।
- K2 ফর্ম: এককালীন অনুদানের জন্য এই ফর্ম ব্যবহার করা হয়। এটি হালকা নীল রঙের কাগজে ছাপানো থাকে।
যাঁরা আগে থেকেই K1 বৃত্তি পাচ্ছেন, তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- K1 Renewal: যেসব ছাত্রী আগে থেকেই K1 বৃত্তি পাচ্ছেন এবং এখনও ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করেননি, তাঁদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা শিক্ষিকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে রিনিউয়ালের ব্যবস্থা করা হবে।
- K2 Upgradation: যেসব ছাত্রীর বয়স সম্প্রতি ১৮ বছর হয়েছে এবং আগে K1 বৃত্তি পেয়েছেন, তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া নির্দিষ্ট প্রি-প্রিন্টেড K2 Upgradation ফর্ম পূরণ করতে হবে। সাধারণ K2 ফর্মের পরিবর্তে এই নির্দিষ্ট ফর্ম ব্যবহার করা জরুরি।
অফলাইনে আবেদন করার পদ্ধতি
- আবেদনপত্র সংগ্রহ: প্রথমে নিজের স্কুল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক K1 অথবা K2 ফর্ম সংগ্রহ করুন।
- ফর্ম পূরণ: আবেদনপত্রে ছাত্রীর নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য নির্ভুলভাবে লিখুন।
- তথ্য যাচাই: ফর্মে লেখা নামের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা নাম মিলিয়ে নিন। পাশাপাশি সচল মোবাইল নম্বর দিন, যাতে প্রয়োজনে আবেদন সংক্রান্ত SMS পাওয়া যায়।
- স্বাক্ষর: আবেদনপত্রের নির্দিষ্ট জায়গায় ছাত্রী ও অভিভাবকের প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর করুন।
- নথিপত্র জমা: আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথির ফটোকপি সংযুক্ত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জমা দিন।
- জমার রসিদ সংগ্রহ: আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর স্কুল বা প্রতিষ্ঠান থেকে Acknowledgement Receipt সংগ্রহ করে নিজের কাছে রাখুন।
- আবেদনের স্ট্যাটাস দেখুন: আবেদন জমা হওয়ার পর নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে Application Number বা Form Number ব্যবহার করে আবেদনের অবস্থা জানা যাবে।
- স্কলারশিপের টাকা: আবেদন অনুমোদিত হলে DBT-এর মাধ্যমে সরাসরি ছাত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে।
K3 – অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম (SVMCM Portal)
K3-এর ক্ষেত্রে আবেদন প্রক্রিয়া K1 ও K2-এর থেকে কিছুটা আলাদা। এই বিভাগের জন্য স্বামী বিবেকানন্দ Merit-cum-Means Scholarship (SVMCM) পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করতে হয়।
অনলাইনে আবেদনের ধাপগুলি হল—
- প্রথমে SVMCM-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
- হোমপেজে থাকা Registration অপশনে ক্লিক করুন।
- প্রযোজ্য নির্দেশিকা ভালোভাবে পড়ে সম্মতি জানান এবং Proceed for Registration অপশনে ক্লিক করুন।
- আবেদনকারীর যোগ্যতা অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক স্কলারশিপ ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন।
- এরপর নাম, জন্মতারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ করুন।
- রেজিস্ট্রেশন সফল হলে একটি Applicant ID তৈরি হবে। এটি ভবিষ্যতের জন্য লিখে রাখুন।
- Applicant ID ও Password ব্যবহার করে পোর্টালে লগ ইন করুন।
- নিজের প্রোফাইল ও আবেদনপত্রের বাকি তথ্য পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন।
- সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করে আবেদনপত্রটি Submit করুন।
মনে রাখবেন: আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি পোর্টালে প্রকাশিত সর্বশেষ নির্দেশিকা দেখে নেবেন। K1, K2 ও K3-এর ফর্ম, যোগ্যতা এবং আবেদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন হতে পারে।