মেয়ের বিয়ে ভালবাসার ব্যাপার, কিন্তু খরচের বোঝা বহন করা অনেক পরিবারের কাছেই কঠিন। এই চাপ কিছুটা লাঘব করতেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার চালু করেছে রূপশ্রী প্রকল্প — রাজ্যের আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের মেয়ের বিয়েতে এককালীন ২৫,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা। ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে চালু এই প্রকল্পের দায়িত্ব মহিলা ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ দপ্তরের হাতে।
আজকের লেখায় থাকছে রূপশ্রী প্রকল্পের যোগ্যতার শর্ত, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট, আবেদন প্রক্রিয়া এবং কোথায় কোথায় যোগাযোগ করতে হবে — সবটা এক জায়গায়। শুরুতেই এক নজরে দেখে নিন প্রকল্পের প্রধান তথ্যগুলো।
এক ঝলকে
এক নজরে রূপশ্রী প্রকল্প
রূপশ্রী প্রকল্প কী এবং কাদের জন্য
রূপশ্রী প্রকল্পের উদ্দেশ্য খুব সরল — যে পরিবার মেয়ের বিয়ের খরচ বহন করতে বেশি গুরুতর চাপে থাকে, তাদের পাশে দাঁড়ানো। আর্থিক সহায়তাটি মেয়ের নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো হয়, ফলে টাকাটা সঠিক জায়গাতেই পৌঁছায়। শর্ত হল পারিবারিক বাৎসরিক আয় ১,৫০,০০০ টাকার বেশি হতে পারবে না, আর আবেদন জমা দেওয়ার দিন মেয়েটির অবিবাহিত থাকতে হবে এবং এটি তার প্রথম বিবাহ হতে হবে।
রূপশ্রী প্রকল্পে যোগ্যতার শর্ত
আবেদন করার আগে নিচের শর্তগুলো একবার মিলিয়ে নিন —
- বাসিন্দা হওয়ার নিয়ম (যেকোনো একটি):
- মেয়েটির পশ্চিমবঙ্গে জন্ম, অথবা
- গত অন্তত ৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস, অথবা
- মেয়েটির বাবা-মা পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা।
- মেয়ের বয়স: আবেদনের সময় কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে।
- পাত্রের বয়স: কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে।
- প্রথম বিবাহ: আবেদন জমার দিন মেয়েটিকে অবিবাহিত থাকতে হবে এবং এই বিবাহই তার প্রথম বিবাহ হতে হবে।
- পারিবারিক আয় সীমা: বছরে ₹১,৫০,০০০-এর বেশি হলে আবেদন করা যাবে না।
রূপশ্রী আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
মেয়ের বয়সের প্রমাণ (যেকোনো একটি):
- জন্ম সার্টিফিকেট
- ভোটার আইডি কার্ড
- আধার কার্ড
- প্যান কার্ড
- মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড
- স্কুল ছাড়ার সার্টিফিকেট
পাত্রের বয়সের প্রমাণ (যেকোনো একটি):
- জন্ম সার্টিফিকেট
- ভোটার আইডি কার্ড
- আধার কার্ড
- প্যান কার্ড
- মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড
- স্কুল ছাড়ার সার্টিফিকেট
বাকি নথি:
- পারিবারিক আয়ের শংসাপত্র
- পশ্চিমবঙ্গের বাসস্থানের প্রমাণ (ডমিসাইল)
- মেয়ের নিজের ব্যাঙ্ক পাসবই
- প্রস্তাবিত বিবাহের প্রমাণ — স্ব-ঘোষণা, বিয়ের আমন্ত্রণপত্র বা বিবাহ নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি (যেকোনো একটি)
- মেয়ে ও পাত্রের রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি
রূপশ্রীতে কীভাবে আবেদন করবেন
রূপশ্রী প্রকল্পে আবেদনের একমাত্র পথ অফলাইন আবেদনপত্র। ধাপে ধাপে এগোন এইভাবে —
- আবেদনপত্র সংগ্রহ করুন আপনার এলাকা অনুযায়ী:
- গ্রামীণ এলাকা → ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারের (BDO) অফিস
- পৌর এলাকা → সাব-ডিভিশনাল অফিসারের (SDO) অফিস
- কর্পোরেশন এলাকা → কমিশনার অফিস
- ফর্ম পূরণ করুন: নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ, শিক্ষা, জাতি, ধর্ম এবং পাত্রের তথ্য দিন। সঙ্গে অবিবাহিত থাকা, প্রথম বিবাহ, পারিবারিক আয় ₹১.৫ লক্ষের কম এবং বয়স ১৮+ — এই স্ব-ঘোষণাগুলোও ভরতে হবে।
- নথি সংযুক্ত করুন: উপরে তালিকাভুক্ত সব কাগজের কপি ফর্মের সঙ্গে জুড়ুন।
- জমা দিন: পূরণ করা আবেদনপত্র যে অফিস থেকে সংগ্রহ করেছেন সেখানেই জমা দিন।
- যাচাই ও টাকা প্রাপ্তি: কর্তৃপক্ষ আবেদন যাচাই করে গৃহীত হলে ₹২৫,০০০ সরাসরি মেয়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে।
আবেদন জমা দেওয়ার সঠিক সময়
এখানেই অনেকে ভুল করেন — রূপশ্রীর আবেদনপত্র জমা দিতে হয় বিয়ের তারিখ থেকে অন্তত ৩০ দিন আগে, কিন্তু ৬০ দিনের বেশি আগে নয়। অর্থাৎ বিয়ের ১ থেকে ২ মাস আগের এই জানালার মধ্যেই আবেদন করতে হবে। আবেদন গৃহীত হলে বিয়ের তারিখের প্রায় ৫ দিন আগে মেয়ের অ্যাকাউন্টে টাকা চলে আসে।
আরেকটি সুখবর — আবেদনপত্র সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায় এবং সারা বছরই সব ব্লক, সাব-ডিভিশনাল ও কর্পোরেশন অফিসে সহজলভ্য থাকে।
যোগাযোগ ও হেল্পলাইন
- রূপশ্রী হেল্পলাইন: ০৩৩-২৩৩৭৩৮৪৬
- মহিলা ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ দপ্তর: ০৩৩-২৩৩৪১৫৬৩, ০৩৩-২৩৩৭১৭৯৭
- অভিযোগের জন্য: নিজের ব্লক, সাব-ডিভিশনাল বা কর্পোরেশন অফিসে যোগাযোগ করুন।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্র: রূপশ্রী প্রকল্পে কত টাকা সহায়তা পাওয়া যায়?
উ: মেয়ের বিবাহের জন্য এককালীন ₹২৫,০০০, যা সরাসরি মেয়ের নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
প্র: রূপশ্রীতে আবেদন করার আয়ের সীমা কত?
উ: পারিবারিক বাৎসরিক আয় ₹১,৫০,০০০-এর বেশি হলে আবেদন করা যাবে না।
প্র: আবেদন কখন জমা দিতে হয়?
উ: বিয়ের তারিখ থেকে অন্তত ৩০ দিন আগে, কিন্তু ৬০ দিনের বেশি আগে নয়।
প্র: রূপশ্রী আবেদন করার নিয়ম কী?
উ: শুধুমাত্র অফলাইন আবেদনপত্রের মাধ্যমে। ফর্ম পাওয়া যায় ব্লক অফিস (গ্রামীণ), সাব-ডিভিশনাল অফিস (পৌর) বা কমিশনার অফিসে (কর্পোরেশন)।
প্র: মেয়ে ও পাত্রের বয়সসীমা কত হতে হবে?
উ: মেয়ের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং পাত্রের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর।
প্র: আবেদনপত্রের জন্য কোনো ফি দিতে হয়?
উ: না, ফর্ম ও আবেদন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। টাকা চেয়ে কেউ মধ্যস্থতা করলে সেটি অভিযোগযোগ্য।
মেয়ের বিয়ের সময় যে অর্থসংকট নিয়ে অনেক পরিবার ভোগে, রূপশ্রী প্রকল্প তার একটা বাস্তবসম্মত সমাধান। তবে নিয়ম মেনে সঠিক সময়ে আবেদন করাই আসল চাবিকাঠি — বিয়ের ৩০–৬০ দিন আগের সময়সীমা মাথায় রেখে আগে থেকেই কাগজপত্র গুছিয়ে ফেলুন। লেখাটি কারও কাজে লাগলে প্রয়োজনের মানুষদের কাছে পৌঁছে দিন, আর নতুন আপডেটের জন্য আমাদের সঙ্গেই থাকুন।





