পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি বিভাগ কর্তৃক চালু কৃষক বন্ধু যোজনা রাজ্যের চাষযোগ্য জমির মালিক ও ভাগচাষিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। কৃষক বন্ধু যোজনা ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে যোগ্য কৃষকরা প্রতি একর জমির জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পান, এবং নামভর্তি কৃষকের অকাল মৃত্যু হলে তার পরিবার ২,০০,০০০ টাকা এককালীন অনুদান হিসেবে পেয়ে থাকে। টাকা যায় ডিবিটি (DBT) পদ্ধতিতে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
আজকের লেখায় থাকছে কৃষক বন্ধু যোজনার সুবিধা, যোগ্যতার শর্ত, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট এবং আবেদন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত আলোচনা। শুরুতেই এক নজরে দেখে নিন প্রকল্পের প্রধান তথ্যগুলো।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | পশ্চিমবঙ্গ কৃষক বন্ধু যোজনা |
| শুরু হয় | ১ জানুয়ারি ২০১৯ |
| নোডাল বিভাগ | কৃষি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার |
| নোডাল ব্যাঙ্ক | ওয়েস্ট বেঙ্গল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক লিমিটেড |
| আবেদন প্রক্রিয়া | অফলাইন আবেদনপত্রের মাধ্যমে |
| সহায়তার পদ্ধতি | DBT-র মাধ্যমে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে |
এক ঝলকে
কৃষক বন্ধু যোজনার দুটি অংশ
এই প্রকল্পের সুবিধা মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা — একটি হলো নিশ্চিত আয়, আর অন্যটি ডেথ বেনিফিট। দুটি অংশেরই সুবিধা আলাদা এবং আবেদনের নিয়মও ভিন্ন। নিচে দুটিরই বিস্তারিত দেওয়া হলো।
১. কৃষক বন্ধু (নিশ্চিত আয়) প্রকল্প
এই অংশের অধীনে যোগ্য কৃষকরা তাদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী প্রতি বছর আর্থিক সহায়তা পান। সহায়তার পরিমাণ নির্ভর করে কৃষকের কাছে কত একর চাষযোগ্য জমি আছে তার ওপর।
- ১ একর বা তার বেশি জমি থাকলে: প্রতি একর পিছু বছরে ₹১০,০০০। অর্থাৎ, রবি শস্যের জন্য ₹৫,০০০ এবং খারিফ শস্যের জন্য ₹৫,০০০ — দুই সমান কিস্তিতে দেওয়া হয়।
- ১ একরের কম জমি থাকলে: প্রতি একর পিছু বছরে ₹৪,০০০। এক্ষেত্রে রবি শস্যের জন্য ₹২,০০০ এবং খারিফ শস্যের জন্য ₹২,০০০ পাওয়া যায়।
২. কৃষক বন্ধু (ডেথ বেনিফিট) প্রকল্প
নামভর্তি কৃষকের অকাল মৃত্যু হলে তার পরিবার বা বৈধ দাবিদার এককালীন ₹২,০০,০০০ অনুদান পেয়ে থাকেন। এই সুবিধা পেতে হলে কৃষকের বয়স মৃত্যুর সময় ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
কৃষক বন্ধু যোজনায় যোগ্যতার শর্ত
এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে হলে কৃষককে নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে —
- চাষযোগ্য জমি থাকা বাধ্যতামূলক: কৃষকের নিজের নামে বা বৈধভাবে বর্গা নেওয়া চাষযোগ্য জমি থাকতে হবে।
- ভূমি রেকর্ড থাকা: জমির অধিকারের রেকর্ড (ROR), পাত্তা, ফরেস্ট পাত্তা বা রেকর্ডকৃত ভাগচাষি (শেয়ার ক্রপার) — এগুলোর যেকোনো একটি থাকতে হবে।
- ভোটার কার্ড বাধ্যতামূলক: প্রকল্পের সুবিধা পেতে ভোটার পরিচয়পত্র থাকা আবশ্যক।
- বয়সসীমা (ডেথ বেনিফিটের ক্ষেত্রে): ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
- পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হবে।
কৃষক বন্ধু আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
আবেদনপত্রের সঙ্গে নিচের কাগজপত্রের ফটোকপি জমা দিতে হবে —
- জমির নথি (যেকোনো একটি): অধিকারের রেকর্ড (ROR) / বর্গা সহ ROR / পাত্তা রেকর্ড / ফরেস্ট পাত্তা
- ভোটার আইডি কার্ড (বাধ্যতামূলক)
- আধার কার্ড
- ব্যাঙ্ক পাসবইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা অথবা একটি বাতিল চেক
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- সক্রিয় মোবাইল নম্বর
যাচাইকরণের সময় অরিজিনাল নথি দেখাতে হবে, তাই সব কাগজ আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা ভালো।
কৃষক বন্ধুতে কীভাবে আবেদন করবেন
কৃষক বন্ধু যোজনায় আবেদন সম্পূর্ণ অফলাইন পদ্ধতিতে নেওয়া হয়। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন —
- সরকারি পোর্টাল বা স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করুন (বাংলা বা ইংরেজি যেকোনো একটি)।
- আবেদনপত্রে সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন।
- উপরে উল্লিখিত ডকুমেন্টগুলোর ফটোকপি সংযুক্ত করুন।
- পূরণ করা আবেদনপত্র নির্দিষ্ট দপ্তরে জমা দিন।
- আবেদন যাচাই হয়ে গেলে টাকা DBT-র মাধ্যমে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হবে।
ডেথ বেনিফিট দাবির প্রক্রিয়া
কৃষকের মৃত্যুর ক্ষেত্রে দাবিদারকে পূরণ করা আবেদনপত্রের সঙ্গে নিচের নথিগুলো জমা দিতে হবে —
মৃত কৃষকের যেকোনো একটি পরিচয়পত্রের ফটোকপি:
- ভোটার আইডি কার্ড
- আধার কার্ড
- প্যান কার্ড
- পাসপোর্ট
এছাড়া দাবিদারের নিজের পরিচয়পত্র ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্যও জমা দিতে হবে। যাচাই সম্পন্ন হলে ₹২,০০,০০০ দাবিদারের অ্যাকাউন্টে পৌঁছাবে।
গুরুত্বপূর্ণ টিপস
- নামের বানান মিলিয়ে নিন: ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, ROR এবং ব্যাঙ্ক পাসবই — সব জায়গায় নাম ও জন্ম তারিখ হুবহু এক রাখুন। বানান না মিললে আবেদন আটকে যেতে পারে।
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে DBT সক্রিয় থাকা চাই: ডিবিটি চালু না থাকলে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও টাকা ব্যাঙ্কে ঢোকে না। আগে থেকেই ব্যাঙ্কে গিয়ে ডিবিটি লিঙ্ক করিয়ে নিন।
- একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করুন: আধার, ব্যাঙ্ক ও আবেদনপত্রে একই ফোন নম্বর দিলে যোগাযোগ ও যাচাইয়ে সুবিধা হয়।
- ROR আপডেট করে নিন: জমির সর্বশেষ অধিকারের রেকর্ড ব্যবহার করা নিরাপদ। পুরোনো ROR হলে ব্লক ল্যান্ড রেকর্ড অফিস থেকে আপডেট করিয়ে নিন।
যোগাযোগ ও হেল্পলাইন
কৃষক বন্ধু যোজনা সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা বা তথ্যের জন্য নিচের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যায় —
- হেল্পলাইন নম্বর: ৮৫৯৭৯৭৪৯৮৯, ৬২৯১৭২০৪০৬
- হেল্পলাইন ইমেল: kbhelpdeskwebel
@gmail.com - অফিশিয়াল পোর্টাল: পশ্চিমবঙ্গ কৃষক বন্ধু পোর্টাল
- আবেদনের অবস্থা: পোর্টালে অনলাইনে ট্র্যাক করা যায়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্র: কৃষক বন্ধু যোজনায় কত টাকা সহায়তা মেলে?
উ: ১ একর বা তার বেশি জমি থাকলে প্রতি একরে বছরে ₹১০,০০০, আর ১ একরের কম জমি থাকলে প্রতি একরে বছরে ₹৪,০০০। কৃষকের মৃত্যু হলে পরিবার ₹২,০০,০০০ পান।
প্র: কৃষক বন্ধুতে আবেদন করা যায় কীভাবে?
উ: সম্পূর্ণ অফলাইনে আবেদনপত্র ভরে জমা দিতে হয়। ফর্ম সরকারি পোর্টাল বা স্থানীয় কৃষি অফিসে পাওয়া যায়।
প্র: কৃষক বন্ধু প্রকল্পে কাদের আবেদন করার যোগ্যতা আছে?
উ: যাঁদের নিজের বা বর্গা চাষযোগ্য জমি আছে এবং সঙ্গে ROR/পাত্তা/ফরেস্ট পাত্তার মতো বৈধ ভূমি রেকর্ড ও ভোটার কার্ড আছে, তাঁরা আবেদন করতে পারেন।
প্র: কৃষক বন্ধু ডেথ বেনিফিটে বয়সসীমা কত?
উ: ১৮ থেকে ৬০ বছর।
প্র: টাকা কীভাবে পাওয়া যায়?
উ: DBT পদ্ধতিতে সরাসরি কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
পশ্চিমবঙ্গ কৃষক বন্ধু যোজনা রাজ্যের কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। চাষের খরচ মেটাতে এবং অকাল মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারকে আর্থিকভাবে পাশে রাখতে এই প্রকল্প কার্যকর। তবে সুবিধা পেতে হলে আগে থেকেই জমির নথি ঠিক করা, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ডিবিটি চালু করা এবং সব কাগজে নামের বানান মেলানো জরুরি। লেখাটি কারও উপকারে এলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন, আর নতুন আপডেটের জন্য আমাদের সঙ্গেই থাকুন।