আজকের আলোচনায় আমরা দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা ‘বহুরূপী’ গল্পের প্রশ্ন উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা, যিনি পেশায় একজন বহুরূপী। অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি নিজের শিল্পকে ভালোবেসে বেঁচে থাকেন। অর্থের প্রতি লোভ না দেখিয়ে নিজের শিল্পের মর্যাদা ও আত্মসম্মান বজায় রাখার যে অসাধারণ দৃষ্টান্ত তিনি তুলে ধরেছেন, তা গল্পটিকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এক ঝলকে
‘বহুরূপী’ – সুবোধ ঘোষ ( বাংলা গল্প)
বহুরূপী গল্পের সারাংশ
হরিদা শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভেতরে একটি ছোট্ট ঘরে থাকেন, অতি দারিদ্র্যের মধ্যে। অনেক দিন তাঁর উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জল ফোটে। তা সত্ত্বেও ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা একঘেয়ে চাকরি তিনি কোনোদিন করতে চাননি — ইচ্ছে করলে অফিস বা দোকানের কাজ পেয়ে যেতেন, কিন্তু একঘেয়েমির প্রতি তাঁর ভয়ানক আপত্তি। তাই তিনি বেছে নেন বহুরূপীর পেশা। মাঝে মাঝে বিচিত্র ছদ্মবেশে পথে বেরিয়ে পড়েন, আর যে সামান্য বকশিশ জোটে তা দিয়েই ভাতের হাঁড়ির দাবি মেটানোর চেষ্টা করেন।
তাঁর ঘরটি বন্ধুদের আড্ডার জায়গা। চা, চিনি আর দুধ বন্ধুরা নিয়ে আসেন, হরিদা শুধু আগুনের আঁচে জল ফুটিয়ে দেন।একদিন আড্ডায় বন্ধুরা জানান — শহরের সবচেয়ে ধনী অথচ কৃপণ জগদীশবাবুর বাড়িতে এক হিমালয়বাসী উঁচু দরের সন্ন্যাসী সাত দিন ছিলেন। তিনি সারাবছর কেবল একটি হরীতকী খান, তাঁর বয়স হাজার বছরের বেশি বলে অনেকে মনে করেন। সন্ন্যাসী কাউকেই পায়ের ধুলো দেননি — জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেছিলেন, আর সন্ন্যাসী বাধ্য হয়ে পা এগিয়ে দিলে সেই ফাঁকে ধুলো নিয়ে নেন। বিদায়ের সময় একশো টাকার একটি নোটও জোর করে সন্ন্যাসীর ঝোলায় ফেলে দেন।
গল্পটা শুনে হরিদা গম্ভীর হয়ে যান। তারপর বলেন — “এবার মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার”। অর্থাৎ এবার এমন এক ‘জবর খেলা’ দেখাবেন, যাতে সারা বছরের রোজগার একবারেই হয়ে যায়।পরিকল্পনা মতো এক সন্ধ্যায় হরিদা এক পরম বিরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হন — আদুড় গায়ে ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে সাদা থান, ঝোলার ভেতরে একটি গীতা। তাঁর শান্ত, গম্ভীর ও উদাত্ত কথায় জগদীশবাবু এতটাই মুগ্ধ হন যে তাঁকে তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে হরিদা সেই টাকার থলি সিঁড়িতে ফেলে রেখেই চলে আসেন — ছুঁয়েও দেখেন না।বন্ধুরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান — বিরাগী সেজে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর শিল্পের “ঢং নষ্ট হয়ে যায়”। একজন গরিব বহুরূপী হয়েও তিনি খাঁটি শিল্পীর মতো শুধু তাঁর প্রাপ্য আট-দশ আনা বকশিশটুকুই দাবি করতে চান।
গল্পের শেষে তিনি বলেন — “খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কী আশা করতে পারে?”
‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার ছদ্মবেশ
এই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল হরিদার বৈচিত্র্যময় ছদ্মবেশ। পরীক্ষায় “হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য” প্রশ্নে এই তালিকাটাই কাজে লাগবে।
লক্ষণীয়: হরিদা কেবল সাজপোশাক বদলাতেন না — তিনি সেই চরিত্রের আত্মাও ধারণ করতেন। তাই পুলিশ সেজে ঘুষ নেন (কারণ পুলিশ ঘুষ নেয়), কিন্তু বিরাগী সেজে টাকা স্পর্শ করেন না (কারণ বিরাগী টাকা ছোঁয় না)। এই সামঞ্জস্যই তাঁর শিল্পের সার্থকতা।
‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার চরিত্র বিশ্লেষণ
১. স্বাধীনচেতা ও ছকভাঙা: দারিদ্র্য সহ্য করতে রাজি ছিলেন, কিন্তু পরাধীনতা বা একঘেয়ে কাজ সহ্য করতে রাজি ছিলেন না।
২. নিখুঁত শিল্পী: যে চরিত্র সাজতেন, তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যেতেন। তাঁর সাজ এতটাই নিখুঁত ছিল যে চেনা মানুষরাও চিনতে পারতেন না।
৩. শিল্পের প্রতি চরম সততা: অর্থের প্রয়োজনে অভিনয় করলেও শিল্পের নিয়ম ভাঙেননি। বিরাগী সেজে টাকা নিলে সেটা তাঁর শিল্পের প্রতি অবিচার হতো।
৪. নির্লোভ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন: একশো এক টাকা তাঁর কয়েক মাসের অভাব মিটিয়ে দিত — তবু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর কাছে শিল্পীর মর্যাদা অর্থের চেয়ে বড়।
৫. বন্ধুবৎসল ও সামাজিক: দারিদ্র্যের মধ্যেও তাঁর ঘর বন্ধুদের আড্ডার জায়গা। চা-চিনি বন্ধুরা আনেন, তিনি জল ফোটান।
৬. বাস্তববোধসম্পন্ন: গল্পের শেষে তিনি স্বীকার করেন — সমাজ তাঁকে ‘খাঁটি মানুষ’ হিসেবে দেখে না, শুধু বহুরূপী হিসেবেই দেখে। এই স্বীকারোক্তিতে সমাজের প্রতি এক প্রচ্ছন্ন অভিমান আছে।
দশম শ্রেণী ‘বহুরূপী’ গল্পের নামকরণ
সাহিত্যে নামকরণ রচনার মূল সুরটি ধরিয়ে দেয়। ‘বহুরূপী’ বলতে এমন একজন মানুষকে বোঝায়, যিনি বিভিন্ন রূপ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে মানুষের মনোরঞ্জন করেন।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী — এটি নামকরণের প্রথম ও সরল কারণ। কিন্তু নামকরণের সার্থকতা কেবল পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গভীরতর কারণ: হরিদা বাইরে বহুরূপী হলেও অন্তরে ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ শিল্পী। জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সাজা তাঁর কাছে কেবল ছদ্মবেশ ছিল না — তিনি সত্যিই সেই মুহূর্তে জাগতিক মোহ ত্যাগ করেছিলেন। একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করে তিনি প্রমাণ করেন, তাঁর শিল্প নিছক ভাঁড়ামি নয়, একটি আদর্শ।
সিদ্ধান্ত: পেশা ও শিল্পসত্তা — দুই দিক থেকেই ‘বহুরূপী’ নামটি গল্পের মূল সুরের সঙ্গে একাত্ম। তাই নামকরণটি ব্যঞ্জনাধর্মী ও সর্বাংশে সার্থক।
পরীক্ষার টিপ: শেষোক্ত উদ্ধৃতিটি মাধ্যমিক ২০১৯ সালে ৩+২ নম্বরে এসেছিল। এই ধরনের উদ্ধৃতি-ভিত্তিক প্রশ্ন প্রায়ই আসে।
বহুরূপী MCQ | Bohurupi Class 10 Short Question Answer
১. ‘বহুরূপী’ গল্পের রচয়িতা কে?
উত্তর: সুবোধ ঘোষ
২. ‘বহুরূপী’ গল্পটি কোন গ্রন্থ থেকে সংকলিত?
উত্তর: গল্পসমগ্র
৩. হরিদার পেশা কী ছিল?
উত্তর: বহুরূপী
৪. হরিদা কোথায় থাকতেন?
উত্তর: শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভেতরে ছোট্ট ঘরে
৫. হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় কী ফোটে?
উত্তর: (গ) শুধু জল ব্যাখ্যা: এটি হরিদার চরম দারিদ্র্যের সবচেয়ে পরিচিত চিত্র।
৬. হরিদা কেন একঘেয়ে চাকরি করতেন না?
উত্তর: (গ) একঘেয়েমি সহ্য করতে পারতেন না
৭. সন্ন্যাসী কোথায় থাকতেন?
উত্তর: হিমালয়ের গুহায়
৮. সন্ন্যাসী সারা বছর কী খেতেন?
উত্তর: একটি হরীতকী
৯. সন্ন্যাসীর বয়স কত বলে অনেকে মনে করেন?
উত্তর: হাজার বছরের বেশি
১০. জগদীশবাবু কীভাবে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন?
উত্তর: সোনার বোল লাগানো কাঠের খড়ম দিয়ে
১১. জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর ঝোলায় কত টাকা জোর করে দিয়েছিলেন?
উত্তর: একশো টাকা
১২. হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়ে কী পেয়েছিলেন?
উত্তর: (ক) একশো এক টাকা ব্যাখ্যা: জগদীশবাবু তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হরিদা তা নেননি।
১৩. হরিদা টাকা নেননি কারণ?
উত্তর: তাঁর ঢং নষ্ট হয়ে যেত
১৪. হরিদা টাকার থলি কোথায় ফেলে আসেন?
উত্তর: সিঁড়িতে
১৫. বিরাগীর ঝোলার ভেতরে কী ছিল?
উত্তর: গীতা
১৬. আড্ডায় চা, চিনি ও দুধ কারা আনতেন?
উত্তর: কথক ও তাঁর বন্ধুরা
১৭. হরিদা কত টাকা বকশিশকে নিজের প্রাপ্য মনে করতেন?
উত্তর: আট-দশ আনা
১৮. চকের বাসস্ট্যান্ডে হরিদা কোন ছদ্মবেশে ছিলেন?
উত্তর: পাগল
১৯. পাগলের চরিত্রে হরিদার মুখে কী মাখা ছিল?
উত্তর: খড়ি
২০. হরিদা পুলিশ সেজে কাকে ধোঁকা দিয়েছিলেন?
উত্তর: স্কুলের মাস্টারমশাইকে
২১. “আমার বুকের ভিতর সব তীর্থ” — উক্তিটির বক্তা?
উত্তর: (গ) বিরাগীবেশী হরিদা
২২. “এবার মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার” —বক্তা?
উত্তর: (খ) হরিদা
২৩. “তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়” — ‘ঢং’ বলতে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: (খ) অভিনয়ের নিখুঁত রূপ বা শিল্পরীতি
২৪. “খাঁটি মানুষ তো নয়” — হরিদা নিজেকে কী বলে মনে করেন?
উত্তর: শুধু একজন বহুরূপী
২৫. জগদীশবাবুর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য?
উত্তর: (খ) ধনী অথচ কৃপণ
২৬. সন্ন্যাসী কারও পায়ের ধুলো দিতেন না — কিন্তু জগদীশবাবু কীভাবে তা পেয়েছিলেন?
উত্তর: কৌশল খাটিয়ে
২৭. হরিদার বাইজি সাজে উপার্জন ছিল?
উত্তর: আট টাকা দশ আনা
২৮. সুবোধ ঘোষ কোন পদক পেয়েছিলেন?
উত্তর: জগত্তারিণী স্বর্ণপদক
২৯. হরিদার ছদ্মবেশের বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর: (খ) চরিত্রের আত্মাও ধারণ করতেন ব্যাখ্যা: এই কারণেই পুলিশ সেজে ঘুষ নেন, কিন্তু বিরাগী সেজে টাকা ছোঁন না — চরিত্রের সঙ্গে আচরণ মিলিয়ে চলতেন।
৩০. ‘বহুরূপী’ নামকরণটি কী ধরনের?
উত্তর: ব্যঞ্জনাধর্মী
দশম শ্রেণী ‘বহুরূপী’ গল্পের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (SAQ)
১. ‘বহুরূপী’ গল্পের রচয়িতা কে?
সুবোধ ঘোষ।
২. হরিদার পেশা কী ছিল?
মাঝে মাঝে বিচিত্র ছদ্মবেশে বহুরূপী সেজে রোজগার করা।
৩. হরিদা কোথায় থাকতেন?
শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভেতরের একটি ছোট্ট ঘরে।
৪. হরিদার দারিদ্র্যের পরিচয় দাও।
অনেক দিন তাঁর উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জল ফোটে; বহুরূপী সেজে পাওয়া সামান্য বকশিশেই তাঁর দিন চলে।
৫. হরিদা কেন নিয়মিত চাকরি করতেন না?
ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা একঘেয়ে কাজ তাঁর ভয়ানক অপছন্দ ছিল; অভাব সহ্য করতেন, কিন্তু একঘেয়েমি নয়।
৬. হরিদার ঘরে আড্ডার ব্যবস্থা কেমন ছিল?
চা, চিনি ও দুধ তাঁর বন্ধুরা আনতেন, হরিদা শুধু আগুনের আঁচে জল ফুটিয়ে দিতেন।
৭. সন্ন্যাসী কোথায় থাকতেন এবং কী খেতেন?
হিমালয়ের গুহায় থাকতেন; সারা বছর কেবল একটি হরীতকী খেতেন।
৮. সন্ন্যাসীর বয়স কত বলে অনেকে মনে করতেন?
হাজার বছরের বেশি।
৯. জগদীশবাবু কীভাবে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন?
একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেছিলেন; সন্ন্যাসী বাধ্য হয়ে পা এগিয়ে দিলে সেই ফাঁকে ধুলো নিয়ে নেন।
১০. জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর ঝোলায় কত টাকা ফেলেছিলেন?
একশো টাকার একটি নোট।
১১. সন্ন্যাসীর গল্প শুনে হরিদা কী সিদ্ধান্ত নেন?
এমন এক ‘জবর খেলা’ দেখাবেন, যাতে সারা বছরের রোজগার একবারেই হয়ে যায়।
১২. হরিদা বিরাগী সেজে কী পরেছিলেন?
আদুড় গায়ে ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে সাদা থান, ঝোলার ভেতরে একটি গীতা।
১৩. জগদীশবাবু হরিদাকে কত টাকা প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন?
একশো এক টাকা।
১৪. হরিদা কেন টাকাটা নেননি?
বিরাগী সেজে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর শিল্পের ‘ঢং’ নষ্ট হয়ে যেত।
১৫. ‘ঢং’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অভিনয়ের নিখুঁত রূপ বা শিল্পরীতি — চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা।
১৬. হরিদা কত টাকাকে নিজের প্রাপ্য মনে করতেন?
আট-দশ আনা বকশিশ।
১৭. হরিদার জীবনের ‘নাটকীয় বৈচিত্র্য’ কী ছিল?
বিচিত্র সব ছদ্মবেশে পথে বেরোনো — কখনও পাগল, কখনও বাইজি, কাবুলিওয়ালা, পুলিশ বা বিরাগী সেজে মানুষকে চমকে দেওয়া।
১৮. হরিদা পুলিশ সেজে কী করেছিলেন?
স্কুলের মাস্টারমশাইকে ধোঁকা দিয়ে আট আনা ঘুষ নিয়েছিলেন।
১৯. হরিদার চরিত্রের শ্রেষ্ঠ দিক কোনটি?
শিল্পের প্রতি চরম সততা ও নির্লোভ আত্মমর্যাদাবোধ।
২০. ‘বহুরূপী’ নামকরণ কেন সার্থক?
হরিদা পেশায় বহুরূপী, আর তাঁর ছদ্মবেশের প্রতি সততা এত গভীর যে তিনি অর্থও ত্যাগ করেন — তাই পেশা ও শিল্পসত্তা দুই দিক থেকেই নামটি সার্থক।
দশম শ্রেণী ‘বহুরূপী’ গল্পের ৩ নম্বরের প্রশ্ন
১. “তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়।” — বক্তা কে?
‘ঢং’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? বক্তা কেন এমন কথা বলেছেন?বক্তা: ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, বহুরূপী পেশায় যুক্ত হরিদা।‘ঢং’ অর্থ: এখানে ‘ঢং’ বলতে চরিত্রের ভান বা অভিনয়ের নিখুঁত রূপকে বোঝানো হয়েছে। একজন শিল্পী যখন কোনো চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন সেই চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলাই তাঁর ঢং বা শিল্পরীতি।
কারণ: হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে একজন সর্বত্যাগী বিরাগী সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে গিয়েছিলেন। সন্ন্যাসীরা ধন-সম্পদ ও লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকেন। জগদীশবাবু যখন তাঁকে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান, তখন হরিদা তা গ্রহণ করেননি। বন্ধুদের কাছে কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন — সন্ন্যাসীর বেশে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর অভিনয়ের পবিত্রতা বা ‘ঢং’ নষ্ট হয়ে যেত। পেটের খিদে থাকলেও একজন খাঁটি শিল্পীর কাছে নিজের শিল্পের প্রতি সততা রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় ধর্ম।
২. “হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না।” — হরিদার নির্লোভ শিল্পীসত্তার পরিচয় দাও।
‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার দারিদ্র্য ও শিল্পবোধের দ্বন্দ্ব অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
দারিদ্র্যের রূপ: হরিদার কোনো স্থায়ী রোজগার ছিল না। অনেক সময় তাঁর উনুন জ্বললেও হাঁড়িতে চাল জোটে না, কেবল জল ফোটে। এই চরম দারিদ্র্য তাঁকে সহজেই লোভী করে তুলতে পারত।
নির্লোভ শিল্পীসত্তা: জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে হরিদা চাইলেই একশো টাকা নিতে পারতেন, যা তাঁর কয়েক মাসের অভাব মিটিয়ে দিত। কিন্তু তিনি তা করেননি। তাঁর যুক্তি ছিল — “বিরাগী সাজ সাজিয়ে নিয়ে আবার টাকা হাতে করে নেব? তাতেই তো আমার ঢং নষ্ট হয়ে যাবে।”অর্থাৎ শিল্পের মর্যাদা রক্ষাই তাঁর কাছে দারিদ্র্য ঘোচানোর চেয়ে বড় ছিল। অভাবের কাছে নতিস্বীকার না করে নিজের শৈল্পিক আদর্শে অটল থাকা হরিদাকে একজন মহান ও নির্লোভ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৩. “অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।” — হরিদা কী ভুল করেছিলেন? অদৃষ্ট ক্ষমা না করার পরিণাম কী? (৩+২)
হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী হলেও সৎ ও আদর্শবান মানুষ ছিলেন। জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখাতে গিয়ে তিনি আদর্শের কাছে নিজের ব্যক্তিগত চাহিদাকে বিসর্জন দেন — এটাই ছিল তাঁর ‘ভুল’।হরিদা যখন যা সাজতেন, মনেপ্রাণে তাই হয়ে উঠতেন। জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে তিনিও মনেপ্রাণে একজন একনিষ্ঠ বিরাগী হয়ে উঠেছিলেন। জগদীশবাবু তাঁকে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলে, টাকা স্পর্শ করলে ‘ঢং’ নষ্ট হবে — এই যুক্তিতে তিনি তা নেননি। এটাই তাঁর ভুল।
পরিণাম: অদৃষ্ট এই ভুল ক্ষমা করবে না — অর্থাৎ হরিদার অভাব কোনোদিন ঘুচবে না। এমনিতেই তাঁর হাঁড়িতে প্রায়ই শুধু জল ফোটে। প্রণামীর টাকা নিলে অন্তত কয়েক দিনের অন্নসংস্থানের চিন্তা দূর হতো। কিন্তু তিনি তা নেননি, তাই অভাবই তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকবে। লেখকের এই মন্তব্যে বিদ্রূপের সুর আছে — সমাজ শিল্পীর আদর্শকে পুরস্কৃত করে না, বরং শাস্তি দেয়।
৪. “হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।” — হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যের পরিচয় দাও।
উৎস: উদ্ধৃতিটি সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের অন্তর্গত, বক্তা গল্পকথক।
পরিচয়: হরিদা ছিলেন এক অতি দরিদ্র বহুরূপী। পেশাগত বৈচিত্র্যের কারণেই তাঁর জীবনে নাটকীয়তা আসত। তিনি ঘড়ির কাঁটা ধরে ধরাবাঁধা কাজ বা অফিসে হাজিরা দিতে পছন্দ করতেন না।
বৈচিত্র্যের স্বরূপ: অভাবের সংসার হলেও তিনি মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে পথে বেরোতেন — কখনও পাগল, কখনও বাউল, কখনও কাপালিক, কখনও কাবুলিওয়ালা, কখনও মেমসাহেব সেজে মানুষকে চমকে দিতেন। এই বিচিত্র সব ছদ্মবেশ ধারণ করে সামান্য যে বকশিশ পেতেন, তা দিয়েই তাঁর দিন চলত।দারিদ্র্যের একঘেয়েমিকে কাটিয়ে ওঠার এই অদ্ভুত শৈল্পিক প্রচেষ্টাই ছিল হরিদার জীবনের ‘নাটকীয় বৈচিত্র্য’।
৫. “আমার বুকের ভিতর সব তীর্থ” — বক্তা কে? কোন প্রসঙ্গে বলেছেন? তাৎপর্য কী?
বক্তা: বিরাগী সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে থাকা বহুরূপী হরিদা।
প্রসঙ্গ: জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীরূপে উপস্থিত হয়ে হরিদা তাঁর গভীর জীবনদর্শনে জগদীশবাবুকে মুগ্ধ করেন। চলে যাওয়ার সময় সিঁড়িতে দাঁড়ালে জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থভ্রমণের খরচের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে অনুরোধ করেন। সেই অনুরোধের উত্তরেই বিরাগীবেশী হরিদা এই কথাটি বলেন।
তাৎপর্য: প্রকৃত বিরাগীর কাছে বাহ্যিক তীর্থস্থানের আলাদা মূল্য নেই — ঈশ্বরের বাস মানুষের হৃদয়ে। মন পবিত্র থাকলে নিজের বুকের ভিতরটাই সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান। এর জন্য আলাদা ভ্রমণের দরকার নেই। এই উক্তির মাধ্যমে হরিদার চরিত্রের সঙ্গে চরম একাত্মতা এবং পার্থিব লোভের ঊর্ধ্বে ওঠার মানসিকতা প্রকাশ পায়।
৬. হরিদার চরিত্রে কোন কোন বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে?
- স্বাধীনচেতা: অভাব সহ্য করতেন, কিন্তু পরাধীনতা নয়।
- নিখুঁত শিল্পী: যে চরিত্র সাজতেন, তার আত্মাও ধারণ করতেন।
- শিল্পের প্রতি সততা: অর্থের প্রয়োজনে অভিনয় করলেও শিল্পের নিয়ম ভাঙেননি।
- নির্লোভ: একশো এক টাকা অনায়াসে প্রত্যাখ্যান করেন।
- আত্মমর্যাদাসম্পন্ন: সমাজে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন, তবু আপসহীন।
- বন্ধুবৎসল: দারিদ্র্যের মধ্যেও তাঁর ঘর বন্ধুদের আড্ডার জায়গা।
দশম শ্রেণী ‘বহুরূপী’ গল্পের বড় প্রশ্ন
১. “হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।” — হরিদা কে? তাঁর জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যের সবিস্তার পরিচয় দাও। (১+৪)
হরিদা কে: সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভেতরের একটি ছোট্ট ঘরে বসবাসকারী এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত গরিব।
নাটকীয় বৈচিত্র্য: স্বাধীনতাপ্রিয় ও একঘেয়েমি-বিরোধী: হরিদা অত্যন্ত গরিব হলেও ঘড়ির কাঁটায় সময় বেঁধে কোনো অফিসে বা দোকানে নিয়ম করে চাকরি করা তাঁর একদমই পছন্দ ছিল না। অভাবের তাড়নায় তাঁর ভাতের হাঁড়িতে অনেক সময় ভাতের বদলে শুধু জল ফুটলেও, একঘেয়ে কাজ করতে তাঁর ভয়ানক আপত্তি ছিল।
বহুরূপীর পেশা গ্রহণ: একঘেয়েমির বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বহুরূপীর সাজ। মাঝে মাঝে উপোস করার পর হঠাৎ একদিন তিনি বিচিত্র ছদ্মবেশে পথে বের হতেন।
নানা রূপের খেলা: কখনও উন্মাদ পাগল সেজে বাসের যাত্রীদের ভয় দেখাতেন, কখনও রুমঝুম ঘুঙুর বাজিয়ে রূপসি বাইজি সেজে পথে বেরোতেন। এছাড়া বাউল, কাপালিক, কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি সাহেব কিংবা পুলিশ সেজে তিনি চমৎকার অভিনয় করে মানুষকে চমকে দিতেন।
অপ্রত্যাশিত চমক: তাঁর সাজ এতই নিখুঁত হতো যে চেনা মানুষেরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়তেন। পুলিশ সেজে স্কুলের মাস্টারমশাইকেও তিনি ধোঁকা দিয়েছিলেন। এই অভাবনীয় ও নিত্যনতুন রূপ ধারণ করে বেঁচে থাকার অভিনব পদ্ধতিটিকেই তাঁর জীবনের ‘নাটকীয় বৈচিত্র্য’ বলা হয়েছে।
২. ‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে হরিদার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদার চরিত্রে বেশ কিছু অসাধারণ দিক ফুটে উঠেছে।
স্বাধীনচেতা মানসিকতা: হরিদা দরিদ্র হলেও অপরের অধীনে ঘড়ির কাঁটা ধরে বাঁধা নিয়মের কাজ করতে রাজি ছিলেন না। অভাব সহ্য করতে তাঁর আপত্তি ছিল না, কিন্তু একঘেয়ে কাজে তাঁর ঘোর অনীহা ছিল।নিখুঁত ও নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী: বহুরূপী হিসেবে হরিদা ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান। পাগল, বাইজি, পুলিশ বা বিরাগী সন্ন্যাসী — যে রূপই তিনি ধারণ করতেন, তা একেবারে নিখুঁত হয়ে উঠত। তাঁর পুলিশ সাজ এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে স্কুলের মাস্টারমশাইও ধোঁকা খেয়েছিলেন।
শিল্পের প্রতি গভীর সততা: জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে যাওয়ার পর জগদীশবাবু তাঁকে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সন্ন্যাসীর চরিত্র ধারণ করে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর “ঢং নষ্ট হয়ে যায়” — এই যুক্তিতে তিনি সেই বিপুল অর্থ প্রত্যাখ্যান করেন। এটি তাঁর পেশা ও শিল্পের প্রতি গভীর সততার প্রমাণ।পার্থিব লোভহীনতা: অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি অবলীলায় টাকার থলি সিঁড়িতে ফেলে রেখে চলে আসেন, সেদিকে ফিরেও তাকাননি। তিনি জানতেন তাঁর অদৃষ্ট হয়তো এই ‘ভুল’ ক্ষমা করবে না, তবু শিল্পের খাতিরে তিনি নির্লিপ্ত থাকতে পেরেছিলেন। বন্ধুবৎসলতা ও সরলতা: শত দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি বন্ধুদের সঙ্গে হৃদ্যতা বজায় রাখেন — তাঁর ঘরই সকাল-সন্ধ্যার আড্ডার জায়গা।উপসংহার: হরিদা কেবল একজন দরিদ্র মানুষ নন, তিনি একজন প্রকৃত শিল্পী। শিল্পের আদর্শ রক্ষা করতে গিয়ে তিনি দারিদ্র্যকে বরণ করেছেন, কিন্তু নিজের বিবেককে বিক্রি করেননি।
৩. জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর সাজে হরিদার উপস্থিতির বর্ণনা দাও।
সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদার বিরাগী বেশে আগমন।
উপস্থিতি ও প্রভাব: সন্ধ্যাবেলায় জগদীশবাবুর বাড়িতে যখন বিরাগীবেশী হরিদা এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর শান্ত ও গম্ভীর মূর্তি দেখে সবাই চমকে যান। তাঁর পরনে ছিল সাদা থান, ধবধবে সাদা উত্তরীয় এবং ঝোলার ভেতরে ছিল একটি গীতা।
সংলাপ ও আচরণ: বিরাগীবেশী হরিদা জগদীশবাবুর ধনের অহংকারকে চূর্ণ করে বলেন — “টাকা তো ধুলো, আর ধুলো তো টাকা।” নিজেকে ‘সৃষ্টির মধ্যে এককণা ধূলি’ বলে উল্লেখ করে তিনি জগদীশবাবুকে বিনয়ী করে তোলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক সংলাপে জগদীশবাবু এতটাই মুগ্ধ হন যে তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকার থলি প্রণামী দিতে চান।
প্রত্যাখ্যান: কিন্তু হরিদা সেই থলি ছুঁয়েও দেখেন না — অবলীলায় সিঁড়িতে ফেলে রেখে নিঃশব্দে চলে আসেন। জগদীশবাবুর আতিথ্যের অনুরোধও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
তাৎপর্য: হরিদার এই আচরণ প্রমাণ করে, তিনি কেবল ছদ্মবেশ ধারণ করেননি — সেই মুহূর্তের জন্য তিনি সত্যিই একজন প্রকৃত বিরাগী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর কাছে শিল্পের সততা অর্থের চেয়ে বড় ছিল। এই দৃশ্যই গল্পের চূড়ান্ত মুহূর্ত এবং হরিদার চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে।
৪. ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার দারিদ্র্য ও শিল্পবোধের দ্বন্দ্ব কীভাবে ফুটে উঠেছে? (৫)
সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের মূল শক্তি হলো হরিদার দারিদ্র্য ও শিল্পবোধের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব।
দারিদ্র্যের চিত্র: হরিদা শহরের সবচেয়ে সরু গলির ছোট্ট ঘরে থাকেন। তাঁর উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় ভাতের বদলে শুধু জল ফোটে। কোনো স্থায়ী আয় নেই — বহুরূপী সেজে পাওয়া সামান্য বকশিশেই দিন চলে। এই চরম অভাব তাঁকে সহজেই লোভী করে তুলতে পারত।
শিল্পবোধের জাগরণ: কিন্তু হরিদা অভাবকে জয় করেন শিল্পের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে। তিনি ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা একঘেয়ে চাকরি নেননি, যদিও পেতে পারতেন। কারণ তাঁর কাছে স্বাধীনতা ও শিল্পের আনন্দ অর্থের চেয়ে বড় ছিল।
দ্বন্দ্বের চরম মুহূর্ত: জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে গিয়ে তিনি একশো এক টাকার প্রণামী পান — যা তাঁর কয়েক মাসের অভাব মিটিয়ে দিত। এখানেই দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়: টাকা নিলে অভাব ঘুচবে, কিন্তু শিল্পের সততা নষ্ট হবে। হরিদা শিল্পের পক্ষে থাকেন — টাকা প্রত্যাখ্যান করেন।
উপসংহার: এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের এক বড় সত্য উন্মোচিত হয় — শিল্পী কেবল পেটের ভাতের জন্য শিল্প করেন না। হরিদার চরিত্রে দারিদ্র্য আছে, কিন্তু দৈন্য নেই। লেখকের এই বিদ্রূপও লক্ষণীয় — “অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না” — অর্থাৎ সমাজ শিল্পীর আদর্শকে মূল্য দেয় না, বরং শাস্তি দেয়।
৫. ‘বহুরূপী’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (৫)
যেকোনো সাহিত্যকর্মের নামকরণ হয় বিষয়বস্তু, চরিত্র বা মূল ভাবের ভিত্তিতে — আবার কখনও তা হয় ব্যঞ্জনাধর্মী।
প্রথম কারণ পেশাগত: ‘বহুরূপী’ বলতে এমন একজন মানুষকে বোঝায়, যিনি বিভিন্ন রূপ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে মানুষের মনোরঞ্জন করেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী — তিনি কখনও উন্মাদ পাগল, কখনও রূপসি বাইজি, কখনও কাবুলিওয়ালা, কখনও পুলিশ বা মেমসাহেব সেজে জীবিকা নির্বাহ করেন। গল্পের মূল ঘটনা আবর্তিত হয়েছে এই বহুরূপী জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে।
দ্বিতীয় কারণ গভীরতর: নামকরণের সার্থকতা কেবল পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা গভীরতর হয়েছে হরিদার অন্তরের ‘বিরাগী’ সত্তার মধ্য দিয়ে। জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সাজা তাঁর কাছে কেবল ছদ্মবেশ ছিল না — তিনি সেই মুহূর্তে সত্যিই জাগতিক মোহ ত্যাগ করেন এবং একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থাৎ তিনি বাইরে বহুরূপী হলেও অন্তরে ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ শিল্পী।
তৃতীয় কারণ শিল্পের সততা: গল্পের চরম মুহূর্তে হরিদা প্রমাণ করেন — একজন গরিব বহুরূপীও খাঁটি শিল্পীর মতো শুধু তাঁর প্রাপ্য আট-দশ আনা বকশিশই দাবি করতে পারেন। এই অসাধারণ শিল্পসত্তা, নির্লোভ মানসিকতা ও সততাই গল্পের মূল উপজীব্য।
সিদ্ধান্ত: বিষয়বস্তুর বিচারে ‘বহুরূপী’ নামকরণটি অত্যন্ত সার্থক ও নিখুঁত। নামটি কেবল একটি পেশাকে বোঝায় না — হরিদার বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা ও আত্মমর্যাদাকে একসঙ্গে ধরে রাখে। তাই নামকরণটি ব্যঞ্জনাধর্মী এবং গল্পের মূল সুরের সঙ্গে একাত্ম।
মাধ্যমিক বাংলা ‘বহুরূপী’ দ্রুত রিভিশন টেবিল (পরীক্ষার আগের রাতে)
মাধ্যমিক বাংলা ‘বহুরূপী’ প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্র: বহুরূপী গল্পটি কার লেখা?
উ: সুবোধ ঘোষ। এটি তাঁর ‘গল্পসমগ্র’-এর তৃতীয় খণ্ড থেকে সংকলিত।
প্র: হরিদা কেন একশো এক টাকা নেননি?
উ: বিরাগী সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর শিল্পের ‘ঢং’ নষ্ট হয়ে যেত — এই কারণেই তিনি টাকা প্রত্যাখ্যান করেন।
প্র: বহুরূপী নামকরণ কেন সার্থক?
উ: হরিদা পেশায় বহুরূপী, আর ছদ্মবেশের প্রতি তাঁর সততা এত গভীর যে তিনি অর্থও ত্যাগ করেন — তাই পেশা ও শিল্পসত্তা দুই দিক থেকেই নামটি সার্থক।
প্র: হরিদার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উ: শিল্পের প্রতি চরম সততা, নির্লোভ মানসিকতা এবং তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ।
প্র: ‘ঢং’ বলতে কী বোঝায়?
উ: অভিনয়ের নিখুঁত রূপ বা শিল্পরীতি — চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা।
প্র: গল্পের মূল বার্তা কী?
উ: শিল্পীর কাছে তার শিল্পের সততা ও আত্মমর্যাদা অর্থের চেয়ে বড় — আর সমাজ সেই আদর্শকে যথাযথ মূল্য দেয় না।





