WBCHSE Class 11: একাদশ শ্রেণির পড়াশোনা ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে আর কোনো রকম গাফিলতি মেনে নেবে না পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল কর্তৃপক্ষের একাংশ একাদশ শ্রেণিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয় না। এই অবহেলার প্রবণতা সমূলে উৎপাটন করতে এবার কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে সংসদ। রাজ্যের স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান ধরে রাখা এবং পঠনপাঠনের নিয়মকানুন সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে এবার স্কুলগুলোতে আচমকা পরিদর্শন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
এক ঝলকে
কেন একাদশ শ্রেণি নিয়ে এত কড়াকড়ি সংসদের?
দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছিল, একাদশ শ্রেণির পঠনপাঠনের প্রতি পড়ুয়াদের একটি বড় অংশের চরম অনীহা রয়েছে। যেহেতু একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার নম্বর উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত ফলাফলে যোগ হয় না, তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ক্লাসটিকে সেভাবে গুরুত্ব দিতে চান না অনেকেই।
কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সর্বভারতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রবেশিকা পরীক্ষায় (Competitive Exams) সফল হওয়ার জন্য একাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, সংসদের নতুন সিলেবাস এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে একাদশ শ্রেণির ভিত মজবুত না থাকলে দ্বাদশ শ্রেণিতে এবং ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষায় পড়ুয়াদের চূড়ান্ত সমস্যার মুখে পড়তে হবে।সেই কারণেই পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এবং শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে এবার থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে একাদশ শ্রেণির পঠনপাঠন পরিচালনা করতে চাইছে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। আর সেই লক্ষ্যেই এই কড়া পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত।
স্কুলগুলির বিরুদ্ধে ঠিক কী কী অভিযোগ সামনে আসছে?
একাদশ শ্রেণির পঠনপাঠন নিয়ে খোদ শিক্ষকদের একাংশই স্কুলগুলির বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, রাজ্যের বহু স্কুলেই একাদশ শ্রেণির সিলেবাস সময়মতো শেষ করা হচ্ছে না। সারা বছর যেটুকু অংশ পড়ানো হচ্ছে, স্রেফ তার ওপর ভিত্তি করেই অত্যন্ত দায়সারাভাবে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি হলো প্রশ্নপত্র সংক্রান্ত। অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছু স্কুল বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র কিনে এনে একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা নিচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও ছাপানো প্রশ্নপত্র দেওয়ার বদলে সরাসরি ব্ল্যাকবোর্ডে প্রশ্ন লিখে দায়সারাভাবে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। এর পাশাপাশি, সারা বছর ধরে একাদশ শ্রেণির ক্লাসে পড়ুয়াদের উপস্থিতির চরম নিম্নহার নিয়েও বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে শিক্ষামহলে। এই সমস্ত গাফিলতি রুখতেই এবার কড়া পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে সংসদ।
নজরদারিতে কড়াকড়ি: কী কী পদক্ষেপ নিতে চলেছে সংসদ?
একাদশ শ্রেণির পঠনপাঠনে স্কুলগুলির এই বেহাল দশা কাটাতে এবার একাধিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যে সমস্ত রদবদল আনা হচ্ছে:
-
আচমকা পরিদর্শন: পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে এবার রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে আচমকা পরিদর্শনে (Surprise Visit) যাবেন সংসদের প্রতিনিধিরা।
-
অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে নজর: স্কুলগুলিতে প্রতিদিনের ক্লাসের রুটিন এবং সারা বছরের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
-
উপস্থিতির সাপ্তাহিক রিপোর্ট: একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়াদের উপস্থিতির হার বাড়াতে ও নজরদারি চালাতে স্কুলগুলির কাছ থেকে হাজিরার সাপ্তাহিক রিপোর্ট তলব করবে পর্ষদ।
-
পোর্টালে প্রশ্নপত্র আপলোডের নির্দেশ: পরীক্ষা নিয়ে যাতে কোনো গাফিলতি না হয়, তার জন্য পরীক্ষা শেষের পর প্রতিটি স্কুলকে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের নিজস্ব প্রশ্নপত্র সংসদের নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করতে হবে।
শিক্ষক সংগঠন ও কর্তৃপক্ষের মত: কী বলছে শিক্ষামহল?
সংসদের এই কড়া নজরদারির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে শিক্ষামহলের একাংশ। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ‘অল পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট টিচার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর মতে, পড়ুয়াদের মধ্যে সচেতনতা ও একাগ্রতা বাড়াতে একাদশ শ্রেণির প্রাপ্ত নম্বর উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত মার্কশিটে যুক্ত করা উচিত। তাদের দাবি, নম্বর যুক্ত হলেই পড়ুয়ারা এই ক্লাসটিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।
তবে সংসদ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আপাতত পরীক্ষা পদ্ধতি বা মার্কশিট তৈরির নিয়মে নতুন করে কোনো বদল আনা হচ্ছে না। স্কুলগুলোতে এই আচমকা পরিদর্শন বা সারপ্রাইজ ভিজিট প্রসঙ্গে সংসদের সভাপতি পার্থ কর্মকার জানিয়েছেন, কাউকে শাস্তি দেওয়া এই পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং স্কুলগুলির পঠনপাঠনে ঠিক কোথায় কোথায় খামতি থেকে যাচ্ছে, তা চিহ্নিত করে শুধরে দেওয়াই সংসদের প্রধান লক্ষ্য, যাতে আখেরে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়।





